আইপিবিইএসের প্রতিবেদন

জীববৈচিত্র্য ধ্বংসে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বার্ষিক ক্ষতি ২৫ লাখ কোটি ডলার

কিছু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দৃশ্যত মানুষের উপকার করলেও জীববৈচিত্র্যের বড় ধরনের ক্ষতি করছে, যা নানামুখী বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠছে।

কিছু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দৃশ্যত মানুষের উপকার করলেও জীববৈচিত্র্যের বড় ধরনের ক্ষতি করছে, যা নানামুখী বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠছে। এসব ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডে যুক্ত রয়েছে কৃষি, জ্বালানি ও মৎস্য আহরণের মতো অতিপ্রয়োজনীয় খাত। ইন্টারগভর্নমেন্টাল সায়েন্স-পলিসি প্লাটফর্ম অন বায়োডাইভারসিটি অ্যান্ড ইকোসিস্টেম সার্ভিসেসের (আইপিবিইএস) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুসারে, স্বল্পমেয়াদে খাতগুলোর প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করে নেয়া কার্যকলাপ জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করছে এবং প্রকৃতি, জলবায়ু ও মানুষের স্বাস্থ্য সংকটকে বাড়িয়ে তুলছে। এসব ঘটনায় বিশ্ব অর্থনীতি বছরে ২৫ লাখ কোটি ডলার ক্ষতির মুখে পড়ছে। খবর এফটি।

প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, সংকট সমাধানে সমন্বয়হীনতা আর্থিক ক্ষতি বাড়িয়ে তুলছে। জীববৈচিত্র্য হ্রাস, জলবায়ু পরিবর্তন, পানি সংকট, খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা ও স্বাস্থ্যঝুঁকিকে আলাদাভাবে মোকাবেলা করা হচ্ছে এখনো। অথচ এতে সমস্যাই শুধু বাড়ছে না, ব্যয়ও বাড়ছে।

আইপিবিইএসে যুক্ত রয়েছে ৯৪টি দেশ। সংস্থাটি বিজ্ঞানভিত্তিক নীতি সম্পর্কে বৈশ্বিক ঐকমত্য তৈরির জন্য কাজ করছে, যা ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জের (আইপিসিসি) সমতুল্য।

প্রতিবেদনটির সহ-লেখক রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্যাম ম্যাকএলউই বলেন, ‘সমস্যাগুলোকে আলাদা আলাদা বিবেচনা করে আমরা অর্থ অপচয় করছি এবং একই কাজের পুনরাবৃত্তি করছি। যদি আমরা নীতিগত খাতগুলোকে একত্রিত করতে পারতাম, তবে উল্লেখযোগ্য খরচ সাশ্রয় হতো।’

তিন বছর ধরে ১৬৫ জন বিজ্ঞানী এ প্রতিবেদন নিয়ে কাজ করেছেন। সেখানে বলা হচ্ছে, নিজেদের ব্যবসায়িক কার্যক্রমে পরিবেশ ও সমাজের কী ক্ষতি হচ্ছে তা ভাবছেন না শিল্প মালিকরা। এ ধরনের উপেক্ষিত ব্যয়ের পরিমাণ ১০ লাখ কোটি থেকে ২৫ লাখ কোটি ডলারের মধ্যে, যা বৈশ্বিক জিডিপির এক-চতুর্থাংশ। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, স্বল্পমেয়াদে উৎপাদন বাড়াতে প্রায়ই দীর্ঘমেয়াদি টেকসই কৃষি ব্যবস্থাকে অবহেলা করা হয়। এতে যথেচ্ছ ব্যবহার হয় রাসায়নিক সার ও কীটনাশক, যা পানির গুণগত মান নষ্ট করে এবং পানিজনিত রোগসহ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়।

প্যাম ম্যাকএলউই বলেন, ‘বর্তমান ব্যবস্থার সমস্যা হলো, আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণে এ ঝুঁকিগুলো বিবেচনায় নিচ্ছি না। আমরা এ খরচ বীমা কোম্পানি বা যারা এ দূষণ ও পুষ্টিহীনতার বোঝা বহন করছে সেই দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর ঠেলে দিচ্ছি।’

প্রতিবেদন অনুসারে, জীববৈচিত্র্যের সমস্যা সমাধানে পারস্পরিক সম্পর্ককে বিচার করা জরুরি। প্যাম ম্যাকএলউইর মতে, সংকটগুলোকে ‘একটি জটিল, আন্তঃসংযুক্ত ব্যবস্থা’ হিসেবে বিবেচনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে পারস্পরিক আপস সম্পর্কে অর্থবহ আলোচনা প্রয়োজন রয়েছে।

আইপিবিইএস গবেষণাটি এমন সময়ে সামনে এনেছে যখন জলবায়ু ও পরিবেশসংক্রান্ত একাধিক বৈঠক ব্যর্থ হয়েছে। এর মধ্যে অক্টোবরে কলম্বিয়ার ক্যালিতে জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্য শীর্ষ সম্মেলনে বৈশ্বিক অর্থায়ন কৌশল নিয়ে আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়।

জীববৈচিত্র্য প্রতি দশকে ২-৬ শতাংশ হারে হ্রাস পাচ্ছে, যা খাদ্যনিরাপত্তা ও জলবায়ু সহনশীলতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনে যুক্ত চরম আবহাওয়ার কারণে গত ৫০ বছরে ১২ হাজার দুর্যোগ ঘটেছে। এর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি ডলার, যার ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রভাবিত হয়েছে নিম্ন আয়ের দেশগুলো। বিদ্যমান সংকট সমাধানে দেরি হলে ভবিষ্যতের বার্ষিক ক্ষতি বৃদ্ধির পরিমাণ ৫০ হাজার কোটি ডলার পর্যন্ত দাঁড়াতে পারে। একইভাবে ১০ বছর দেরি করলে ব্যয় দ্বিগুণ হয়ে যাবে।

পরিবেশগত পরিবর্তন নিয়ে গত কয়েক দশকে একাধিক ফোরামে বারবার আলোচনা দেখা গেছে। এক্ষেত্রে আলোচ্য বিষয়ের একটি হলো, সংকটে থাকা অর্থনীতির জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ। কিন্তু প্রকৃত ক্ষতি মোকাবেলার জন্য প্রতিশ্রুত অর্থ খুব একটা ভূমিকা পালন করছে না। একই সঙ্গে সরকারি বাজেটের ক্ষেত্রে জীববৈচিত্র্য রক্ষাকে গুরুত্ব না দেয়ার অভিযোগ তোলা হয়েছে প্রতিবেদনে।

সেখানে বলা হচ্ছে, বর্তমানে সরকারগুলো এমন সব খাতে বছরে ১ লাখ ৭০ কোটি ডলার ভর্তুকি দেয়, যা পরিবেশগতভাবে ক্ষতিকর কার্যক্রমকে উৎসাহিত করে। এর মধ্যে রয়েছে জীবাশ্ম জ্বালানি উত্তোলন, অতিরিক্ত মৎস্য আহরণ ও স্বল্পমেয়াদে কৃষি ব্যবস্থাপনা।

সমস্যার পরিধি বড় হলেও সমাধান অসম্ভব নয়—এমনটাই বলা হচ্ছে প্রতিবেদনে। এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশে সফলভাবে এ ধরনের পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লিখিত হয়েছে যে বিলম্বিত পদক্ষেপে ব্যয় দ্বিগুণ হবে। তবে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ ১০ লাখ কোটি ডলার ব্যবসায়িক সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ৩৯ কোটি ৫০ লাখ কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে।

আরও